কি এমন হলো যে হঠাৎ করে দলে দলে রাস্তায় নেমে আসতে হলো বলে যারা বিস্ময়ে চোখ দুটো লাড্ডুর মতো গোল গোল করে ফেলছেন, তারা যদি তাদের বিস্ফারিত চোখকে আরও সুদুরপ্রসারী করতেন তবে ঘটনার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা কিছু কিছু নির্মম সত্য হয়ত দেখতে পেতেন। সত্য হচ্ছে: কোটার কারণে চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলেই বেকাররা রাস্তায় নেমে এসেছেন এমন নয়, বরং এই চাকরি না পাওয়ার পেছনে আরও কিছু অনুঘটক রয়েছে। চোখ থেকে ঠুলি খুললে এবং কান থেকে তুলো সরালে অনেক কিছুই দেখা যায়, শোনাও যায়। যেদিন প্রজ্ঞাপনের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করতে চাওয়া শিক্ষার্থীদেরকে শাসন করলো ছাত্রলীগ সেদিন বিকেলে শাহবাগে পারভেজ নামে এক তরুণের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করার পর এখন ওই বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রশাসনিক অফিসার পদে চাকরি করলেও তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। কারণ বেতন কম, পরিশ্রম অমানবিক। সাকল্যে বারো হাজার টাকা বেতন দিয়ে এই দুর্মূল্যের ঢাকা শহরে তিনি একাই চলতে পারছেন না, উপরন্তু গ্রামে পথ চেয়ে থাকা মা বাবাকে চালাবেন কি করে? অথচ এই পারভেজই যখন শিক্ষার্থী ছিলেন তখন প্রতি সেমিস্টারে কমপক্ষে কুড়ি হাজার টাকা এই বিশ্ববিদ্যালয়কেই দিয়েছেন। সেমিস্টারের টাকা গুণতে গুণতে প্রায় নিঃস্ব হয়েছেন তার বাবা। এখন ছেলে সংসারের হাল ধরবে, এমন প্রত্যাশা যদি বৃদ্ধ বাবা করেন তবে তাকে ফৌজদারী মামলায় অভিযুক্ত করা যায় না নিশ্চয়।
যারা ‘সরকারি চাকরিই কেন করতে হবে, বেসরকারি চাকরি কী নেই’ বলে নিত্য চোখ রাঙান তারা পারভেজ এবং পারভেজদের বুকে কান পাতলে অনেক কিছুই শুনতে পাবেন। সোলায়মান সুখন আর আয়মান সাদিকদের মোটিভেনাল বক্তব্য থেকে কান সরিয়ে নিয়ে যদি এইসব পারভেজদের বুকে কান পাতা যায় তবে সেখানে শুনতে পাওয়া যায় সীমাহীন বেতন বৈষম্য, অমানবিক শ্রম শোষণ, অনায্য মানবসম্পদ নীতিমালা, জঘন্য কর্মপরিবেশ, পরিশ্রমের স্বীকৃতি না পাওয়া, তোষামোদকারীদের পোয়াবোরো, অনৈতিকভাবে চাকরি স্থায়ীকরণ না করা, প্রমোশন-ইনক্রিমেন্ট আটকে রাখা, বেতনের পাশাপাশি অন্যান্য আর্থিক সুবিধা (যেমন প্রফিডেন্ট ফান্ড, গ্রাচ্যুইটি ইত্যাদি) না দেওয়া, নিম্নপদস্থদের সঙ্গে উচ্চপদস্থদের দুর্বীনিত আচরণ ইত্যাদির চাপাকান্না।
ইদানিং একটি মুখরোচক বক্তব্য প্রায়ই শোনা যায় যে, মেধাবীদের চাকরির অভাব হয় না। এইসব বক্তাদের জন্যও পারভেজ একজন দৃষ্টান্ত। এই তরুণ ইতিমধ্যে দু’বার সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) নিয়োগ পরীক্ষায় ভাইভাবোর্ডের চৌকাঠ মাড়িয়েছেন, দু’বারই পিএসসি কর্তৃক নন ক্যাডার চাকরির জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন কিন্তু কোনোবারই চাকরি হয়নি। পুলিশ ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছেন তিনি। ঠিক কি কারণে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানেন না পারভেজ তবে অনুমান করেন, তার বাবা যেহেতু মাদ্রসার শিক্ষক ছিলেন, সেই অপরাধে হয়ত পুলিশ তার নামে নেতিবাচক প্রতিবেদন দিয়েছে। খানিকটা ধরা গলায় বলেন, ‘আব্বার সারাদিন কাটত মস্টারি করে আর খেত খামারে কাজ করে। রাজনীতি করা তো দূরের কথা, কোনো দলকে সমর্থন করার মতোও অবসর ছিল না তার। আর আমার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোটা সময় গেছে টিউশনির পেছনে। আব্বা কষ্টেশিষ্টে সেমিস্টার ফি জোগাড় করতে পারতেন, কিন্তু থাকা খাওয়ার খরচ তো আমাকেই জোগাতে হতো। এ বাসা থেকে ও বাসা, ও বাসা থেকে সে বাসা ঘুরে ঘুরে টিউশনি করতে করতে পায়ে কড়া পড়ে গেছে, আমার রাজনীতি করার সময় কই বলুন!’
![]() |
| স্থিরচিত্র: বিবিসি |
সরকারি চাকরির ভেরিফিকেশনে এই ‘রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খোঁজা’ এক নবতর ব্যাধির নাম। সরকারি মতাদর্শী নয়—এমন যেকোনো দলের সঙ্গে লতায় পাতায় জড়ানো কোনো দূরবর্তী সংশ্লিষ্টতা পেলেই তাকে সরকারি চাকরির অযোগ্য বলে বিবেচনা করা হচ্ছে, তা তিনি যতই মেধাবী হোন না কেন। আর পুরনো ব্যাধি, যার নাম নিয়োগ বাণিজ্য, সেটা মহামারী আকার ধারণ করেছে এই সময়ে। পারভেজের কোন বন্ধু কত টাকায় কোন চাকরি বাগিয়েছেন সেসবেরও ফিরিস্তি জানা গেল তার মুখেই। বিষয়টির প্রতি বিশ্বাস আরও প্রগাঢ় হলো সাউথ এশিয়ান জার্নালে ড. হাবিব সিদ্দিকীর একটি নিবন্ধ পড়ে। তিনি সরকারের সাবেক এক মন্ত্রীর নামোল্লেখ করে বলেছেন, সেই মন্ত্রী এক চাকরিপ্রার্থী তরুণকে আট লাখ টাকা হাদিয়ার বিনিময়ে চাকরি দিয়েছেন। (আগ্রহীরা পড়তে পারেন: http://southasiajournal.net/bangladeshs-unemployment-nightmare/)
এরপর আছে আবেদন ফির খড়গ। অফেরতযোগ্য ব্যাংকড্রাফট আর পে অর্ডারের খরচ যোগাতে গিয়ে কতজন যে প্রেমিকার জন্মদিনের উপহার কিনতে পারেননি তার খবর জানা নেই কোনো সরকারি প্রেস উইংয়ের। ড. হাবিব সিদ্দিকী ওই নিবন্ধেই বলেছেন, শুধু পত্রিকার পাতাতে চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়েই কত প্রতিষ্ঠান যে কত কোটি কোটি টাকা পকেটে ভরছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি, বেসরকারি এক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আমার এক বন্ধুকে চাকরি স্থায়ীকরণ পরীক্ষায় বসার জন্যও এক হাজার টাকা আবেদন ফি গুণতে হয়েছে। পরে পরীক্ষার দিন আমার বন্ধু দেখেন, তার মতো আরও প্রায় পাঁচশ পরীক্ষার্থী উপস্থিত। অর্থাৎ আমার বন্ধু যে পদে চাকরি করছে সেই পদেই লোক নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। বন্ধুটি অবশ্য বলতে পারেনি যে, ভাই আপনারা যে পদে পরীক্ষা দিতে এসেছেন সেই পদে অলরেডি আমি চাকরি করছি! এবং দিন শেষে ওই পরীক্ষার্থীদের কাউকেই চাকরি দেয়া হয়নি। শুধু মাঝখান থেকে প্রত্যেকের কাছ থেকে এক হাজার টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এক হাজার গুণন পাঁচশ সমান কত হয় যেন?
যাহোক, বন্ধুর কথা থাক, পারভেজের কথা বলি। সেই পারভেজ, যিনি দুই দুইবার সরকারি চাকরির সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও চাকরি পাননি, সেই তিনি তবু হতাশ হননি। সোলায়মান সুখনদের বক্তৃতা শুনে উদ্বুদ্ধ হয়ে সিক্স ডিজিট স্যালারির আশায় অবশেষে এদিন পা বাড়ান প্রাইভেট খাতে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য। অতঃপর এখানে এসে দেখেন, তিনি ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে এসে পড়েছেন। কি আর করা! এখন চেষ্টা করছেন এখান থেকে অন্যকোনো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার। বন্ধু বান্ধবের অনেকেই চাকরি করছেন নামীদামী মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানগুলোতে। কিন্তু তাদের সঙ্গে যতবারই যোগাযোগ করছেন ততোবারই তারা বলছে, ‘তুই-ই ভালো আছিস, তুই-ই ভালো আছিস!’
তাদের কণ্ঠ শুনেই পারভেজ বুঝে ফেলেন, বন্ধুরা কেউ ভালো নেই। সবাই শুধু দাঁতে দাঁত চেপে বৈরি সময়টাকে পার করছে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? তাই পথে নেমেছেন। পারভেজ ভালো করেই জানেন, কোটা সংস্কার হলেই তিনি চাকরি পাবেন না। অথবা চাকরি পেলেও সেই চাকরিটা একেবারে রসমালাই হবে না। সেখানেও থাকবে নানা অসন্তুষ্টি। তারপরও পথে নেমেছেন এই আশায় যে, চাকরি ব্যবস্থার পুরোটাই খোলনলচে পাল্টানো দরকার। সেটা না হয় কোটা সংস্কার দিয়েই শুরু হোক।

0 Comments
Post a Comment