সাতান্ন হাজার বর্গমাইলজুড়ে যেদিন থেকে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করল, সেদিন থেকেই একটি বক্তব্য শোনা যেতে থাকল বিভিন্ন এলাকার সাংসদ পদপ্রার্থীদের তরফ থেকে। তা তিনি মাশরাফি হোন আর হিরো আলম হোন---সবার বক্তব্য একটিই। বক্তব্যটি হচ্ছে: ‘এলাকার উন্নয়নের জন্য নির্বাচন করতে চাই।’ গত ২৫ নভেম্বর মাশরাফি তাঁর ফেসবুক পাতায় নির্বাচনে আসার কারণ ব্যাখ্যা করে লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা যে উন্নয়নকাজ করছেন, তাঁর সারথি হয়ে আমার এলাকার জন্য কিছু করতে চাই।’ অপরদিকে বগুড়া-৪ আসন থেকে সিংহ প্রতীক নিয়ে সাংসদ পদপ্রার্থী হওয়া হিরো আলম বিভন্ন গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এলাকার ছোট ছোট উন্নয়নকাজ করার জন্য তিনি ‘এমপি’ হতে চান। 

শুধু মাশরাফি বা হিরো আলম নন, সারা দেশের চিত্রই মূলত এটি। আপনি কান পাতলেই শুনতে পাবেন, বিভিন্ন মিছিল থেকে ভেসে আসছে শ্লোগান---‘অমুক ভাইয়ের দুই নয়ন/অমুক এলাকার উন্নয়ন।’ অর্থাৎ তারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়ন করবেন। আর বলা নিষ্প্রয়োজন, উন্নয়ন বলতে তারা রাস্তা-ঘাট-সেতু-কালভার্ট  ইত্যাদি তৈরি করাই বোঝেন।

বক্তব্যটি ক্লিশে, পুরনো এবং বিভ্রান্তিকর। কারণ, এলাকার তথাকথিত উন্নয়ন করার জন্য সংসদে যেতে হয় না। সংসদে যেতে হয় আইন প্রণয়নের জন্য। তাই সাংসদদের বলা হয় আইনপ্রণেতা। এলাকার রাস্তা-ঘাট-সেতু-কালভার্ট ইত্যাদি অবকাঠামোগত উন্নয়ন করার জন্য স্থানীয় সরকার রয়েছে। মূলত তাদেরই দায়িত্ব এসব করার।

তারপরও আমাদের স্বনামধন্য সাংসদ পদপ্রার্থীরা কেন এই বক্তব্য দিয়ে আসছেন যুগ যুগ ধরে? তারা কি তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে অবগত নন? অবশ্যই অবগত। এবং সেই সঙ্গে এটিও অবগত যে, স্থানীয় সরকারের হাতে কোনো ক্ষমতা নেই। আমাদের উপজেলা সরকার এবং ইউনিয়ন পরিষদ সরকারের ক্ষমতা অতিসংকুচিত। তাদের জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ থাকে খুবই সামান্য পরিমাণে।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার প্রথমবারের মতো ইউনিয়ন পরিষদ আইন পাশ করে ২০০৯ সালে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞসহ পরিষদের প্রতিনিধিরাও একে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলে মনে করেন। তবে আইনটির কার্যকারিতা অনেক ক্ষেত্রেই নেই। যেমন: আইনে কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনাসহ সরকারের সাতটি বিভাগ ইউনিয়ন পরিষদে স্থানাস্তরের কথা থাকলেও তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

বিধান আছে, ইউনিয়ন পরিষদ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করবে। পরিকল্পনা হয়, কিন্তু এর বাস্তবায়ন হয় না। কেননা, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য অর্থের সংস্থান দরকার; এর নিয়ন্ত্রণ পরিষদের হাতে নেই। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ সরকারের নানা বিভাগ যেসব উন্নয়নকাজ করে, সেসব কাজে পরিষদের কোনো মতামতই প্রাধান্য পায় না।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার বছরেই সারা দেশে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বলে রাখা ভালো, নির্বাচনটি হয়েছিল ১৯ বছর পর। এটা আওয়ামী লীগ সরকারের এক বড় সফলতা বলে বিবেচিত হয়। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাফল্যের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের এই স্তরকে অনেকটা ক্ষমতাহীন করে ফেলার সাফল্যও বর্তায় ওই সরকারেরই ঘাড়ে। এত দিন উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা ছিলেন সাংসদেরা। কিন্তু ২০০৯ সালের এপ্রিলে উপজেলা পরিষদ আইনে সংশোধনী এনে উপজেলা পরিষদে সাংসদদের পরামর্শ গ্রহণকে বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলে স্থানীয় সরকারের এই স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকলেও আর্থিক ও প্রশাসনিক কোনো ক্ষমতা তাদের হাতে নেই। উপজেলায় মূলত আমলাতন্ত্র আর সাংসদতন্ত্রই বিরাজমান।

সঙ্গতকারণে বুঝতে অসুবিধা হয় না, সংসদ সদস্যরা কেন কথায় কথায় এলাকার উন্নয়ন করতে চান। 

এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার। দরকার বিকেন্দ্রীকরণ। এবং আরও স্পষ্টভাবে বললে বলতে হয়, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ দরকার। যদিও বহুদিন ধরে এবিষয়ে সুশিল সমাজের ব্যক্তিবর্গ, গবেষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে অনেকেই অনেক কথা বলছেন। এমনকি বিগত সরকারের অর্থমন্ত্রী এ নিয়ে বইও লিখেছেন। হয়েছে অনেক সভা-সেমিনারও। কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা কোনো সরকার কখনোই গ্রহণ করেনি। 

সে যাইহোক, আপনি স্বীকার করুন আর না-ই করুন, বিকেন্দ্রীকরণ যেকোনো সরকারের জন্য একটি অবশ্যপালনীয় কর্তব্যে পরিণত হযেছে। কারণ, জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান এখন সপ্তম। আর অষ্টম দেশ রাশিয়া! লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, পৃথিবীর যেসব দেশে বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থা চালু রয়েছে, সেসব দেশ মূলত জনসংখ্যার আকারকেই প্রধান বিবেচনায় নিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ করেছে। বাংলাদেশেরও উচিত, তার বিপুল পরিমাণ জনসাধারণের সকলের সুযোগ-সুবিধার সমতা নিশ্চিত করার জন্য বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

আমরা প্রতিবেশি দেশ ভারতের দিকে তাকালে দেখতে পাব, সেখানে তারা সংবিধানের ৭৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে তিন স্তর বিশিষ্ট সরকার চালু করেছে। সবচেয়ে নিচের স্তরে রয়েছে গ্রাম পঞ্চায়েত। দ্য হিন্দু পত্রিকার এক প্রতিবেদন বলছে, স্থানীয় স্বশাসনের এই ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে ভারতের রাজ্য ও কেন্দ্রীয় রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বেড়ে গেছে।
এখন দেশজুড়ে বেজে চলেছে নির্বাচনী ইশতিহারের ডামাডোল। নির্বাচনী দলগুলো নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মোতাবেক ইশতিহার প্রকাশ করছে। কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো দলের নেতা-নেত্রীর মুখেই বিকেন্দ্রীকরণ প্রসঙ্গটি জোরালোভাবে উঠে এল না।