![]() |
| সালভাদর দালির আঁকা দ্য ফেস অব ওয়ার |
সত্য হচ্ছে, আন্দোলন ছাড়া এই দেশে অর্জন খুব বেশি নেই। তা আপনার নাগরিক অধিকার হোক, সামাজিক অধিকার হোক কিংবা রাষ্ট্রীয় অধিকার হোক। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আদায় করে নিতে হয় আপনার দাবি দাওয়া, চাওয়া পাওয়া। কিন্তু যে আপনি আন্দোলন সংগ্রাম করলেন, প্রভূত আত্মত্যাগ করলেন, সেই আপনি কী আন্দোলনের সুফল ভোগ করে শান্তিতে মরতে পারেন? আসুন, সত্য স্বীকার করুন এবং বলুন, আপনি আন্দোলনের সুফল ভোগ করতে পারেন না। কারণ আপনি একজন মধ্যবিত্ত।
মূলতঃ মধ্যবিত্ত শ্রেণিই পরিবর্তনকামী; ফলে তারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় নেমে পড়েন আন্দোলনে। অনেক রক্ত ও অশ্রু বিসর্জনের পর একদিন আন্দোলন শেষ হয় বটে, এবং অতঃপর তিনি দেখতে পান, যে দাবি দাওয়া পূরণের জন্য তিনি আন্দোলন করেছেন সেই দাবি দাওয়ার সুফল ভোগ করছে উচ্চবিত্তরা। আরো একবার সত্য স্বীকার করে বলতে হয়, আন্দোলনকারীরা কখনো আন্দোলনের সুফল ভোগ করে যেতে পারে না। বিশেষত: মধ্যবিত্ত, নিন্মবিত্ত ও প্রান্তিক আন্দোলনকারীরা। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ মহান মুক্তিযুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাত কোটি। এরমধ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল মাত্র দুই লাখের কিছু বেশি (মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা অনুসারে)। এর সঙ্গে ৩০ লাখ শহীদ যোগ করলে দাঁড়ায় ৩২ বা সাড়ে বত্রিশ লাখ। বলে রাখা নিষ্প্রয়োজন, এই সাড়ে বত্রিশ লাখের ৯৫ শতাংশই ছিল কৃষক, শ্রমিক, জেলে, মজুরসহ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ—যারা নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তনের প্রত্যাশায় যুদ্ধে নেমেছিল। তারা ভেবেছিল, দেশ স্বাধীন হলেই তাদের মধ্যে আর্থিক স্বচ্ছলতা আসবে, ছেলেমেয়েরা শিক্ষার অধিকার পাবে, লেখাপড়া শেষে বড় বড় চাকরি পাবে ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশ স্বাধীনের আগে যিনি কৃষক ছিলেন, দেশ স্বাধীনের পর তিনি কৃষকই আছেন; উপরন্তু আগুনে পুড়ে গেছে বসতভিটা, যিনি দিনমজুর ছিলেন তিনি দিন মজুরই আছেন, যিনি রিকশাচালক ছিলেন তিনি আর রিকশাও চালাতে পারেন না, যুদ্ধে পা হারিয়ে হয়েছেন ভিক্ষুক। কিন্তু যুদ্ধের আগে যিনি ছিলেন চালের আড়তদার, যুদ্ধের পর তিনি হয়েছেন চালকলের মালিক, যিনি ছিলেন জমিদার তিনি হয়েছেন জোতদার।
উদাহরণ হিসেবে নব্বুইয়ের গণ আন্দোলনও বিবেচ্য হতে পারে। গণতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গ করলেন নূর হোসেন, ডা. মিলন; কিন্তু সুফল ভোগ করছেন কতিপয় রাজনীতিক। এবং যে এরশাদের বিরুদ্ধে ছিল এই আন্দোলন, সেই এরশাদ এখন গণতন্ত্রের অন্যতম সুফলভোগী!
সম্ভবত এইসব নিগুঢ় সত্য উপলব্ধি করতে পেরেছে পরিবর্তনপ্রেমী মধ্যবিত্ত। তাই ঈদের আগে কিংবা পরে—কোনো সময়ই আর আন্দোলনে আগ্রহ পাচ্ছে না মহান মধ্যবিত্ত।

0 Comments
Post a Comment