কে যেন একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নিই না। এখন দেখা যাচ্ছে, আমরা বর্তমান থেকেও শিক্ষা নিই না। এবং সেইসঙ্গে এটা বললে সম্ভবত অত্যুক্তি হবে না যে, এই বঙ্গদেশের হোমোসেপিয়েন্সরা আসলে কোনো কিছু থেকেই শিক্ষা নেয় না। তা না হলে, ভারতের মুম্বাই শহর দখল করে সম্প্রতি কৃষকরা যে অভূতপূর্ব আন্দোলনের জন্ম দিলেন এবং শেষাবধি দাবি আদায় করে ছাড়লেন—সেই আন্দোলন থেকে কিছু না কিছু কেন শিখব না?
![]() |
| ঢাকার শাহবাগে কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। ছবিসূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। |
একটা আন্দোলন, কিন্তু শেখার আছে অনেক কিছু। তবে সেই প্রসঙ্গে প্রবিষ্ট হওয়ার আগে একটু নিজ দেশ পানে তাকাতে চাই। আকছার আন্দোলন হচ্ছে এ শহরে। প্রেসক্লাব, শহীদ মিনার, শাহবাগে গেলে নজরে পড়ে কোনো না কোনো আন্দোলন চলছেই। এখন যে আন্দোলনটা সবচেয়ে জোরেসোরে চলছে সেটা নিঃসন্দেহে কোটা সংস্কার আন্দোলন কিংবা সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ করার আন্দোলন। লাখে লাখে উচ্চশিক্ষিত বেকার এ দেশে কুকুরবিড়ালসম জীবনযাপন করলেও আন্দোলনে দেখা যায় শত শত। হাজার হাজারও নয়। ৫৬ শতাংশ কোটার কারণে আপনার চাকরি হচ্ছে না বলে যদি মনে করেন, তাহলে আপনি কেন গৃহকোণে বসে আছেন? কেন আন্দোলনে শামিল হচ্ছেন না ভ্রাত? আপনি যদি মনে করেন সেশন জটের কারণে আপনার বয়স খোয়া গেছে বিধায় সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন না, তাহলে আপনি কেন ঘরে বসে বসে অশ্বডিম্বে তা দিচ্ছেন? কেন আন্দোলনে শারিক হচ্ছেন না ভগিনী? বোধকরি আপনাদিগের পিঠ এখনো দেয়াল অব্দি ঠেকেনি। যাদের পিঠ ইতিমধ্যে দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে গেছে সেই শ খানেক ভাই-বোনই বিজ্ঞাপন বিরতির মতো দু-চারদিন বিরতি দিয়ে দিয়ে জড়ো হচ্ছেন শাহবাগ-প্রেসক্লাবে। এবং সংখ্যালঘুর ললাটবিধি অনুসারে প্রহার খাচ্ছেন পুলিশের। যাচ্ছেন জেলে অথবা হাসপাতালে।
চলুন, ভারতের কিষাণ আন্দোলনে নজর দেই এবার। কৃষিঋণ মওকুফের দাবিসহ ১৩ দফা দাবি নিয়ে ভারতের মহারাষ্ট্র প্রদেশ থেকে হাজার হাজার কৃষক ১৮০ মাইল পথ খালি পায়ে হেঁটে মুম্বাই শহরে এসেছেন। উদ্দেশ্য, মুম্বাইয়ে অবস্থিত মহারাষ্ট্রের সংসদ ঘিরে ফেলা৷ অমসৃণ পিচের পথ আর ইট-খোয়ার চুম্বনে চুম্বনে রক্তাক্ত হয়েছে পা, তবু পিছু হটেননি তারা। লেনিনের ভাস্কর্য ভেঙে পথ অবরোধ করাসহ আরো হরেক রকমের বাধা তো ছিলই। তারপরও কোথাও কোনো বিশৃঙ্খল ঘটনা ঘটেনি। আমরা হলে কি করতাম তা বলা বোধকরি নিষ্প্রয়োজন। এটা নিঃসন্দেহে শিক্ষা নেওয়ার মতো একটা ঘটনা, বলার অপেক্ষা রাখে না। নিজেদের স্বার্থেই আমাদের এই তালিমটুকু নেওয়া উচিত নয় কি?
![]() |
| পায়ে হেঁটে মহারাষ্ট্র থেকে মুম্বাই দখল করতে যাচ্ছেন হাজার হাজার কৃষক। ছবি: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। |
ভারতে তখন চলছিল মাধ্যমিক পরীক্ষা৷ তাই পরীক্ষার্থীদের যাতে অসুবিধা না হয়, সে জন্য দিনের বেলায় পথ দখল না করে আজাদ ময়দানে সময় কাটিয়েছেন কৃষকরা৷ তারপর সারারাত ধরে পথ হেঁটেছেন৷ দরিদ্র, নিপীড়িত কৃষকদের এই সামাজিক চেতনাবোধ থেকে আমরা কি কিছুই শিখব না? আর কতকাল পথঘাট বন্ধ করে দিয়ে আন্দোলন করব আমরা? অবশ্য এ দেশে আনন্দ মিছিলও হয় রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়ে। জনসভায় যোগ দিতেও লাখ লাখ মানুষ রাস্তা বন্ধ করে দেয়। এমনকি এদেশের ভিআইপিরাও নিজেদের নিশানওয়ালা গাড়ি নিয়ে ছোটেন সাধারণের পথ বন্ধ করে দিয়ে।
অতঃপর সারা রাত হেঁটে হেঁটে একসময় মুম্বাই শহরে পৌঁছেছেন মহারাষ্ট্রের কৃষকরা। মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত করেছেন পুরো শহর। কিন্তু কি আশ্চর্য! পুলিশ তাদের ওপর কোনো লাঠি চার্জ করেনি। ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসও ছোঁড়েনি। এবং মোদি সরকার অবশেষে মেনে নিয়েছে কৃষকদের দাবি। কি আশ্চর্য! আমাদের পুলিশ ভাই কি কিছু শিখবেন এখান থেকে? শিখবেন কি কিছু সরকার বাহাদুর? গায়ের জোরে আর কত? একুশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিকদের একজন জার্গেন হাবারমাস বলেছেন, ‘যারা যুক্তিতে পারেন না, বুদ্ধিতে পারেন না, তারা গায়ের জোর খাটান। যারা অসৎ ও অপরাধী তারাই পেশিশক্তির মাধ্যমে মুক্তি খোঁজে।’ আপনারা নিশ্চয় যুক্তিবুদ্ধিহীন চাঁড়াল নন। যৌক্তিক দাবি আদায়ে যারা পথে নামে তাদের সঙ্গে পশুর মতো আচরণ করতে আপনাদেরও লজ্জা হয় বলেই আমাদের বিশ্বাস।
দীর্ঘ প্রায় দুশো মাইল পথ খালি পায়ে হেঁটে কৃষকরা যখন মুম্বাই শহরে পৌঁছান, তখন অনেকের পা দিয়েই ঝরছিল রক্ত। এ দৃশ্য সইতে পারেননি মুম্বাইবাসী। তারা ছুটে এসেছেন সেবার হাত বাড়িয়ে। ক্লান্ত অবসন্ন কৃষকদের ক্ষুধা, তৃষ্ণা নিবারণে এগিয়ে এসেছেন তাঁরা৷ টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে প্রকাশ, অনেকেই নিজেদের ঘরের দরজা পর্যন্ত খুলে দিয়েছেন৷ দীর্ঘ পথ হাঁটার ক্লান্তি দূর করতে এগিয়ে দিয়েছেন পানি এবং খাবার৷ রাতভর রাজপথে তাদের সেবাযত্ন করেছেন৷ রক্তমাথা পায়ে ওষুধের প্রলেপ দিয়েছেন৷ নিজেরা উদ্যোগী হয়ে কৃষকদের জন্য জুতা-স্যান্ডেল কিনেছেন, যাতে ফেরার পথটা সুগম হয়৷ একবার মনে করার চেষ্টা করুন তো, এমন সহমর্মিতার দৃশ্য কখনো দেখেছে কি না শহর ঢাকা? এমন মানবিক হতে পারবে কি এ নগরবাসীর কংক্রিট মন? এখানে মনের পরতে পরতে অবিশ্বাস আর সন্দেহ। এখানে পায়ে পায়ে নিঃশ্বাস ফেলে ভয়। ওরা কারা? ওরা কোন দল? কেন পথে নেমেছে? নিশ্চয় মতলব খারাপ! এসবের মধ্যে জড়ানোর দরকার নেই বাবা! কখন কোন বিপদে পড়ব কে জানে!! এই হচ্ছে আমাদের গড় মানসিকতা। এ মানসিকতা যদি বদলানোর প্রয়োজন বোধ করি তবে মুম্বাইবাসী হতে পারে আমাদের দিশারী।
ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদন বলছে, ভারতের আইআইটির বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেভাবে খাবার দিয়ে আন্দোলনকারীদের সহযোগিতা করেছে তা নজিরবিহীন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সম্ভবত পণ করেছেন তারা এ ধরনের নজির স্থাপন করবেন না। নজির স্থাপন করার মতো কোপাকুপি, ধস্তাধস্তি, ছাত্রীদের শ্লীলতাহানি ইত্যাদির মতো নানা বিষয় রয়েছে। সে সবেই তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাছাড়া ‘আপনা মাসে হরিণা বৈরি’ আপ্তবাক্যকে মনে হয় তারা অহর্নিশ প্রমাণ করবেন বলেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন।
দীর্ঘ প্রায় দুশো মাইল পথ খালি পায়ে হেঁটে কৃষকরা যখন মুম্বাই শহরে পৌঁছান, তখন অনেকের পা দিয়েই ঝরছিল রক্ত। এ দৃশ্য সইতে পারেননি মুম্বাইবাসী। তারা ছুটে এসেছেন সেবার হাত বাড়িয়ে। ক্লান্ত অবসন্ন কৃষকদের ক্ষুধা, তৃষ্ণা নিবারণে এগিয়ে এসেছেন তাঁরা৷ টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে প্রকাশ, অনেকেই নিজেদের ঘরের দরজা পর্যন্ত খুলে দিয়েছেন৷ দীর্ঘ পথ হাঁটার ক্লান্তি দূর করতে এগিয়ে দিয়েছেন পানি এবং খাবার৷ রাতভর রাজপথে তাদের সেবাযত্ন করেছেন৷ রক্তমাথা পায়ে ওষুধের প্রলেপ দিয়েছেন৷ নিজেরা উদ্যোগী হয়ে কৃষকদের জন্য জুতা-স্যান্ডেল কিনেছেন, যাতে ফেরার পথটা সুগম হয়৷ একবার মনে করার চেষ্টা করুন তো, এমন সহমর্মিতার দৃশ্য কখনো দেখেছে কি না শহর ঢাকা? এমন মানবিক হতে পারবে কি এ নগরবাসীর কংক্রিট মন? এখানে মনের পরতে পরতে অবিশ্বাস আর সন্দেহ। এখানে পায়ে পায়ে নিঃশ্বাস ফেলে ভয়। ওরা কারা? ওরা কোন দল? কেন পথে নেমেছে? নিশ্চয় মতলব খারাপ! এসবের মধ্যে জড়ানোর দরকার নেই বাবা! কখন কোন বিপদে পড়ব কে জানে!! এই হচ্ছে আমাদের গড় মানসিকতা। এ মানসিকতা যদি বদলানোর প্রয়োজন বোধ করি তবে মুম্বাইবাসী হতে পারে আমাদের দিশারী।
ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদন বলছে, ভারতের আইআইটির বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেভাবে খাবার দিয়ে আন্দোলনকারীদের সহযোগিতা করেছে তা নজিরবিহীন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সম্ভবত পণ করেছেন তারা এ ধরনের নজির স্থাপন করবেন না। নজির স্থাপন করার মতো কোপাকুপি, ধস্তাধস্তি, ছাত্রীদের শ্লীলতাহানি ইত্যাদির মতো নানা বিষয় রয়েছে। সে সবেই তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাছাড়া ‘আপনা মাসে হরিণা বৈরি’ আপ্তবাক্যকে মনে হয় তারা অহর্নিশ প্রমাণ করবেন বলেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন।
আরো একটি বিষয়, যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কিষাণদের এ আন্দোলনে সংহতি ও সমর্থন জানিয়ে পাশে ছিল শিবসেনা। অনেকেই ওয়াকিবহাল তবু বলি, শিবসেনা হচ্ছে বিজেপির শাখা সংগঠন। এই আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছিল কংগ্রেসও৷ দ্য হিন্দুর সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, ‘ভারতের ইতিহাসে বোধহয় এই প্রথম কোনো বামপন্থি সংগঠনের আন্দোলনের শরিক হয়েছিল বিজেপির শাখা সংগঠন এবং কংগ্রেস৷’ আন্দোলনের শুরুর দিকেই কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী টুইটে লিখেছিলেন, ‘ইগো ছেড়ে মাটির মানুষের কথা ভাবুন ফড়নবিশ সরকার৷’ দেবেন্দ্র ফড়নবিশ হচ্ছেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী। আমি মাঝে মাঝেই স্বপ্ন দেখি, আমাদের বেকার ভাইবোনরা আন্দোলনে নেমেছে আর তাদের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ডানপন্থী, বামপন্থী সবাই। নায্য দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন সজীব ওয়াজেদ জয়! আমি যদি এই স্বপ্ন পূরণের অাবদার জানাই সেটা কি খুব বেশি অন্যায় আবদার হবে?
স্বপ্নের কথা থাক, বাস্তবের কথা বলি। মহারাষ্ট্রের কৃষকদের এ আন্দোলন থেকে আমরা তাহলে কী শিখতে পারি? মোটা দাগে বলতে গেলে এ আন্দোলন থেকে প্রথমত আন্দোলনকারীরা শিখতে পারে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের তামিল, দ্বিতীয়ত: রাজনৈতিক দলগুলো শিখতে পারে, যেকোনো যৌক্তিক আন্দোলনেও সমর্থন দেয়া যায়, তৃতীয়ত: শহরবাসী শিখতে পারে, যেকোনো নায্য দাবি আদায়কারীদের প্রতি সংহতি ও সহমর্মিতা জানানোর উপায়, চতুর্থত: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিখতে পারে, কী উপায়ে আন্দোলনকারীদের সেবা ও সহযোগিতা করা যায়, পঞ্চমত: পুলিশ বাহিনী শিখতে পারে, সহিংস না হয়েও আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং ষষ্ঠত: সরকারের কর্তাব্যক্তিরা শিখতে পারেন, আন্দোলন যৌক্তিক হলে তা মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
স্বপ্নের কথা থাক, বাস্তবের কথা বলি। মহারাষ্ট্রের কৃষকদের এ আন্দোলন থেকে আমরা তাহলে কী শিখতে পারি? মোটা দাগে বলতে গেলে এ আন্দোলন থেকে প্রথমত আন্দোলনকারীরা শিখতে পারে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের তামিল, দ্বিতীয়ত: রাজনৈতিক দলগুলো শিখতে পারে, যেকোনো যৌক্তিক আন্দোলনেও সমর্থন দেয়া যায়, তৃতীয়ত: শহরবাসী শিখতে পারে, যেকোনো নায্য দাবি আদায়কারীদের প্রতি সংহতি ও সহমর্মিতা জানানোর উপায়, চতুর্থত: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিখতে পারে, কী উপায়ে আন্দোলনকারীদের সেবা ও সহযোগিতা করা যায়, পঞ্চমত: পুলিশ বাহিনী শিখতে পারে, সহিংস না হয়েও আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং ষষ্ঠত: সরকারের কর্তাব্যক্তিরা শিখতে পারেন, আন্দোলন যৌক্তিক হলে তা মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।


0 Comments
Post a Comment